আমার গল্প -পর্ব ০৪:

ভাষা না জানার কষ্ট

বিদেশে থাকার সবচেয়ে বড় কষ্ট কি জানেন?
অনেকেই ভাবেন—টাকার সমস্যা, কাজের চাপ, বা একাকিত্ব। কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে বড় কষ্ট ছিল একটা জিনিস। সেটা হলো;
“ভাষা না জানার কষ্ট।”
আমি যেহেতু চরিত্রগত ভাবে খুব মানুষের সাথে মিশতে চাওয়া একজন স্বাধীন চেতা মানুষ, তাই আমার বুকটা মনে হয় ফেঁটে যেত যখন আমি মানুষের সাথে communicate করতে পারতাম না।
জাপানে আসার পর প্রথম কয়েক মাস আমি যেন হঠাৎ করেই বোবা হয়ে গিয়েছিলাম।
সেই চঞ্চল দুরন্ত ছেলেটা যেন হটাৎ করেই নিরব হয়ে পড়েছিল।
চারপাশে সবাই কথা বলছে, আলোচনা করছে, কাজ করছে, মজা করছে —কিন্তু আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। দোকানে গেলে কিভাবে কথা বলবো বুঝি না, কোথাও একা যাবার সাহস পাই না, কোথাও কিছু জানতে চাইলে কিভাবে প্রশ্ন করবো বা বলবো জানি না।
অনেক সময় শুধু মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করতাম মানুষ কি বলতে চাইছে।
সেই সময় একটা অদ্ভুত অনুভূতি হতো। মনে হতো আমি যেন এই সমাজের মধ্যে থেকেও একটু আলাদা হয়ে গেছি।
ভাষা না জানলে মানুষ শুধু কথা বলতে পারে না, শুধু এমন না —সে নিজের চিন্তাও ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারে না।
এই অভিজ্ঞতাটা আমাকে খুব শক্তভাবে একটা বিষয় বুঝিয়ে দিয়েছিল।
সেটা হলো; যদি জাপানে সত্যি টিকে থাকতে চাই, যদি এখানে নিজের জায়গা তৈরি করতে চাই—তাহলে জাপানিজ ভাষা আমাকে শিখতেই হবে।
তখন মনে হয়েছে , বাঁচলে একটা স্বাধীন গাছের মতো বাঁচবো , পরগাছা হয়ে না।
জাপানিজ ভাষা শিখার জন্য কেউ আমাকে বাধ্য করেনি। কোন পরীক্ষায় পাশ করার জন্য ও নয়।
এটা ছিলো আমার সাথে আমার একটা বড়ো চ্যালেঞ্জ।
তখন আমার মনে হতো , আমি তো একজন ভালো খেলোয়াড় (ক্রিকেট , ব্যাডমিন্টন , ফুটবল সব গুলোই দারুন খেলতাম), আমি তো হারতে শিখিনি , আমি ভাষা শিখেই ছাড়বো।
তারপর, আমি একরূপ ক্রেজি হয়ে গেলাম। জীবনে কিছু এচিভ করতে গেলে আপনাকে ক্রেজি হতে হবে। কিছু পেতে গেলে কিছু দিতে হবে।
I mean dedication. Focus.
The kind of mindset where you refuse to give up.
এটা ছিল নিজের প্রয়োজন থেকে নেওয়া একটা সিদ্ধান্ত।
আমি তখন বুঝেছিলাম, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম না। ভাষা আসলে সুযোগের দরজা। আর সেই সুযোগের দরজা টা সম্পর্কে যদি আপনি আর্লি স্টেজ এ বুঝতে পারেন , তাহলে সফলতা আপনার কাছে আসবেই।
ভাষা জানলে মানুষকে বোঝা যায়, সমাজকে বোঝা যায়, আর নিজের পথ তৈরি করাও সহজ হয়।
আজ পিছনে তাকালে মনে হয়, সেই সিদ্ধান্তটা আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল। এবং আমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলাম।
আমাকে হয়তো ভাষা শিখতে ২-৩ বছর কষ্ট করতে হয়েছে এটা সত্য , কিন্তু তার ফসল আমি অলরেডি গত ২৬ বছর ধরে ভোগ করছি , এবং যতদিন বেঁচে আছি ততো দিনই ভোগ করবো ইনশাল্লাহ। তাহলে আপনি বলেন , কি দারুন একটা সিদ্ধান্ত আমি নিয়েছিলাম তাই না।
কারণ সেই ভাষাগত এবং আমার Interpersonal & communication স্কিল ই আমাকে এতো দূর নিয়ে এসেছে। “সুযোগ নামের” জীবনের অনেক দরজা খুলে দিয়েছে।
কিন্তু ভাষা শেখার পথটা মোটেও সহজ ছিল না।
কিভাবে স্টেপ বাই স্টেপ ভাষা শিখলাম , কিভাবে কি ধরণের টেকনিক ব্যবহার করলাম
সেই গল্পটাই বলবো পরের পর্বে।
চলবে…

error: Content is protected !!