আমার গল্প -পর্ব ০৯:

নিজের ভেতরের পরিবর্তন

একটা কথা আমি সবসময় খোলাখুলি বলি। আমি ছোটবেলা থেকে খুব মেধাবী ছাত্র ছিলাম না। হয়তোবা ট্যালেন্ট ছিলাম , কিন্তু পড়াশোনার মনোযোগ একেবারেই ছিল না।
জন্ম রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস এর মধ্যে। বাবা ছিলেন রাজশাহী ইউনিভার্সিটি স্কুল / কলেজের হেড মাস্টার। আমরা তাকে হারাই ১৯৯২ সালে। দারুন একজন সৎ মানুষের ঘরে আমার জন্ম। আমি একজন সৌভাগ্যবান মানুষ। তার দেওয়া সৎ শিক্ষা এখন ও ধারণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
আমি ছিলাম খুব ভালো একজন খেলোয়াড় , ব্যাডমিন্টন রাজশাহী বিভাগ চ্যাম্পিয়ন ছিলাম। ক্রিকেট খেলেছি ফার্স্ট ডিভিশন লিগে।
স্কুল/কলেজ এর ষ্পোর্টস ডে তে সব পুরস্কার আসতো আমাদের বাসায় , ১০০ মিটার দৌড় , ৪০০ মিটার রিলে , হাই জাম্প , লং জাম্প ইত্যাদি ইত্যাদি।
নির্মাণ স্কুল ক্রিকেটে আমরা পর পর তিন বছর চ্যাম্পিয়ন ছিলাম।
আমার বন্ধু-টিম মেট “সৈকত ” এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের একজন সেরা আম্পায়ার। আমাদের বাংলাদেশের গর্ব।
রাজশাহী ইউনিভার্সিটির ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট ক্রিকেট টিম খুব ভালো ছিলো, এখান থেকে ন্যাশনাল লেভেল এর প্লেয়ার তরী হতো, ক্যাপ্টেন ছিলাম এই ক্রিকেট টিমের প্রথম বর্ষ থেকেই।
যখন ক্লাস Six এ পড়ি , তখন থেকেই ক্রিকেট খেলে টাকা ইনকাম করা শুরু করেছিলাম।
ওই সময় আমরা যারা খেলতাম , তাহের সমাজে খারাপ নজরে দেখা হতো , সবাই মনে করতো শুধু বই পরেই জীবনে বড়ো হওয়া যায়।
আর সন্ধ্যার পর ব্যান্ড মিউজিক এর সাথে জড়িত ছিলাম। গান গাইতে পারি, গিটার এবং কীবোর্ড বাজাতে পারি। অনেক কনসার্ট ও করেছি দেশের ভিতরে।
বুঝতেই পারছেন , কি ধরনের ছন্নছাড়া মানুষ ছিলাম আমি। যেহেতু ভালো খেলতাম এবং রাজশাহীর স্থানীয় হওয়ায়, দাপটের সাথে রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে এবং রাজশাহী শহরে কেটেছে আমার প্রথম ২২ টা বছর।
তখন হয়তো আমি নিজেও বুঝতাম না, আমার আসল শক্তিটা কোথায়। কিন্তু জাপানে আসার পর একটা বড় পরিবর্তন শুরু হলো।
এখানে এসে আমি বুঝলাম—শুধু মেধা দিয়ে সব কিছু হয় না। আসলে মেধা বলে কিছু নেই।
এখানে দরকার ধারাবাহিকতা, দায়িত্ববোধ, আর নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ।
যেহেতু ছোট বেলা থেকেই ভালো একজন প্লেয়ার ছিলাম, তাই টিম ওয়ার্ক এবং জেতার মানুষিকতা ছোট বেলা থেকেই অনেক শক্ত ছিল। কোন মতেই হারার মানুষ না আমি। খেলাধুলার মাধ্যমে Consistency জিনিষটা শিখেছিলাম অনেক ছোট বেলা থেকেই।
জাপানের আসার পর শুরুতে আমি অনেক কিছুতেই পিছিয়ে ছিলাম।
ভাষা জানি না।
কাজে নতুন।
পরিবেশ পুরো আলাদা।
কিন্তু একটা জায়গায় আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—আমি থামবো না। আমি হয়তো সবচেয়ে স্মার্ট না, কিন্তু আমি সবচেয়ে Consistent হতে পারি।
আর এই চিন্তাটাই আমার জীবন বদলে দেয়।
আমি ধীরে ধীরে নিজের অভ্যাসগুলো বদলাতে শুরু করি। আগে যেটা আজ না করে কাল করবো বলতাম , সেটা এখন আজই শেষ করার চেষ্টা করি। কারণ আমাদের জীবনে কালকে গ্যারান্টিড না।
আগে কিছু বুঝতে কষ্ট হলে সেটা এড়িয়ে যেতাম। এখন সেটা বোঝার চেষ্টা করি। আগে ভুল করলে লজ্জা পেতাম, এখন ভুল থেকে শেখার চেষ্টা করি ।
এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠলো।
আমি বুঝতে পারলাম—সফল মানুষ আর সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য খুব বড় কিছু না।
পার্থক্যটা আসে “অভ্যাসে”।
জীবনে বড় কিছু পেতে সব সময়ই অনেক কঠিন কাজ করার প্রয়োজন হয় না , প্রয়োজন হলো প্রতিদিন ছোট ছোট কাজ গুলো নিয়মিত করা।
“Consistency is the key”
আপনি প্রতিদিন কি করছেন, কিভাবে সময় ব্যবহার করছেন, কিভাবে চিন্তা করছেন—এসবের উপরই সব নির্ভর করে।
জাপান আমাকে একটা জিনিস শিখিয়েছে—
আপনি কে, সেটা আপনার অতীত ঠিক করে না।
আপনি প্রতিদিন কি করছেন, সেটা আপনার ভবিষ্যৎ ঠিক করে।
তারপর আমি নিজের উপর কাজ করতে শুরু করলাম।
ধৈর্য শিখলাম।
নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখলাম।
কঠিন সময়েও স্থির থাকা শিখলাম।
ধীরে ধীরে আমি নিজেই বুঝতে পারলাম—আমি বদলে যাচ্ছি।
এই পরিবর্তনটা একদিনে আসেনি।
এটা এসেছে প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত থেকে। আজ যদি কেউ আমাকে দেখে বলে—আপনি অনেক কিছু Achieve করেছেন—
আমি জানি, এটা কোনো একদিনের সাফল্য না। এটা নিজের ভেতরের পরিবর্তনের ফল।
যে ছেলে একসময় খুব Average ছিল, সে ও যদি নিজের উপর কাজ করে, তাহলে সেও অনেক দূর যেতে পারে।
এটাই আমার সবচেয়ে বড় বিশ্বাস।
কিন্তু এই পরিবর্তনের পর আমার সামনে আরেকটা নতুন প্রশ্ন এসে দাঁড়ালো—
এখন আমি কি করবো?
কিভাবে আমি আমার পরের ধাপে যাবো?
সেই সিদ্ধান্তের গল্পটাই বলবো পরের পর্বে।
চলবে…

error: Content is protected !!