আমার গল্প -পর্ব ০৬:

সময়ের সাথে যুদ্ধ

জাপানিজ শেখার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল।
কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত ধরে রাখা সহজ ছিল না।
কারণ আমার সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল—”সময়”।
পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম কাজ করতে হবে , ভাষা শিখতে হবে। নিজেকে মোটিভেট করতে হবে।
সব মিলিয়ে সময়টা ছিল অনেক কঠিন।
তখন আমি বুঝেছিলাম , সময় জীবনে কোনদিন ই আসবে না , সময় তৈরি করতে হবে।
আমি একটা ছোট নিয়ম বানিয়েছিলাম—যেটা হলো ; যত কিছুই হোক প্রতিদিন জাপানিজ শিখবো।
আমি জাপানিজ শেখার জন্য আলাদা সময় খুঁজিনি। আমি আমার প্রতিদিনের জীবনকেই জাপানিজ শেখার সময় বানিয়ে ফেলেছিলাম।
আমি আমার চারপাশকেও আমার শিক্ষক বানিয়ে ফেলেছিলাম।
যেমন :
ট্রেনে গেলে ঘোষণাগুলো মন দিয়ে শুনতাম। ট্রেন এর মধ্যে যে এডভারটাইজ গুলো লাগানো থাকতো , ওই গুলো পড়ার চেষ্টা করতাম , কানজি গুলো রিভাইস দেবার চেষ্টা করতাম। দোকানে গেলে সাইনবোর্ড পড়ার চেষ্টা করতাম। মানুষ কিভাবে কথা বলছে সেটা লক্ষ্য করতাম।
কাজের জায়গায় সহকর্মীরা কিভাবে কথা বলে, কি শব্দ ব্যবহার করে—এসব আমি মন দিয়ে শুনতাম। কোনো নতুন শব্দ শুনলে মেমো করতাম।
অনেক সময় বুঝতাম না, কিন্তু শুনতে থাকতাম।
তার মধ্যে টাইম ম্যানেজমেন্ট করার জন্য যেই জিনিস গুলো খুব মেনে চলতাম সেগুলো হলো ;
১. ছোট সময়কে কাজে লাগানো (Micro Time Use)
আমি বড় সময়ের অপেক্ষা করিনি।
৫ মিনিট, ১০ মিনিট—যত ছোট সময়ই পেয়েছি, সেটাকে ব্যবহার করেছি।
যেমন :
ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করা
বাসে বসে থাকা
লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা
এই সময়গুলোতে আমি নতুন শব্দ মনে করতাম বা আগের শব্দগুলো রিভিউ করতাম।
এই ছোট সময়গুলো যোগ হয়ে অনেক বড় সময় হয়ে যায়।
২. নতুন শব্দ সাথে সাথে লিখে রাখা
আমি একটা ছোট নোটবুক রাখতাম।
যখনই নতুন কোনো শব্দ শুনতাম—ট্রেনে, দোকানে, অফিসে—আমি সেটা লিখে রাখতাম।
তারপর রাতে বা ফাঁকা সময়ে সেই শব্দগুলো আবার দেখতাম।
এভাবে প্রতিদিন ৫–১০টা শব্দ জমতে জমতে অনেক শব্দ হয়ে যায়।
৩. শুনে শেখা (Active Listening)
আমি চেষ্টা করতাম মানুষের কথাবার্তা মন দিয়ে শুনতে।
সহকর্মীরা কিভাবে কথা বলে
কোন পরিস্থিতিতে কি শব্দ ব্যবহার করে
কিভাবে বাক্য তৈরি করে
অনেক সময় পুরোটা বুঝতাম না, কিন্তু শুনতে থাকতাম।
ধীরে ধীরে কান অভ্যস্ত হয়ে যায়।
ভাষা শেখার বড় অংশই আসলে শুনে শেখা।
৪. বাস্তব জীবনে ব্যবহার করা
শুধু বই পড়লে ভাষা ঠিকভাবে আসে না।
আমি চেষ্টা করতাম যতটা সম্ভব জাপানিজে কথা বলতে।
ভুল হতো, কিন্তু তবুও বলতাম।
দোকানে
কাজের জায়গায়
বন্ধুদের সাথে
এই বাস্তব practice আমাকে দ্রুত উন্নতি করতে সাহায্য করেছে।
৫. নিজেকে জাপানিজ পরিবেশে রাখা
আমি যতটা সম্ভব জাপানিজ পরিবেশে থাকার চেষ্টা করতাম।
যেমন ;
জাপানিজ TV দেখা
রেডিও শোনা
জাপানিজ সংবাদ পড়া
চারপাশের লেখা পড়া
এতে ভাষাটা ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে যায়।
এছাড়াও ,
বাড়িতে খুব বেশির রান্না করতাম না , কারণ জাপানে বাইরের খাওয়া খুব হাইজেনিক , বাইরেই খেতাম।
এতে রান্না করার সময়টা জাপানিজ পড়ার জন্য ব্যবহার করতাম।
ইচ্ছা করেই প্রথম ৭টা বছর কারুরু সাথে মিশিনি। বন্ধু বানালে তাকে সময় দিতে হবে , সেই সময় টা তো আমার ছিল না।
এই সময় থেকেই একা চলতে শিখে যাই , কারণ জীবনে একটা সময় এর পর একাই চলতে হয়।
এভাবেই আমি ২৪ ঘন্টার এক দিন কে ভার্চুয়ালি ৩৫-৩৬ ঘন্টা বানাতাম।
আরেকটা বিষয় আমাকে খুব সাহায্য করেছিল। আমি নিজেকে সময় দিয়েছিলাম।
আমি জানতাম এটা একদিনে হবে না। তাই তাড়াহুড়ো করিনি। প্রতিদিন একটু একটু করে এগোতে থাকলাম।
জীবনের এই প্রান্তে এসে দেখলাম , জীবনে কোন কিছু পেতে হলে খুব কঠিন কাজ করতে হয় না।
যেটা দরকার , সেটা হলো ছোট ছোট কাজ গুলো নিয়মিত ভাবে প্রতিদিন করার অভ্যাস তৈরী করা , এবং সেটা মেইনটেইন করা।
আমি মনের অগোচরেই বিন্দু বিন্দু জলে সিন্ধু বানিয়ে ফেলেছিলাম।
আজ পিছনে তাকালে বুঝি, সেই ছোট ছোট সময়গুলোই সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করেছে।
ভাষা শেখার জন্য সব সময় বড় সময় দরকার হয় না। দরকার নিয়মিত থাকা। Mindset ঠিক রাখা। Never GiveUp এটিচিউড ধরে রাখা।
প্রতিদিন একটু একটু করে এগোলে, একসময় অনেক দূর চলে যাওয়া যায়। জীবনের অনেক বিষয়ই আসলে এমন।
ছোট ছোট অভ্যাসই বড় ফল তৈরি করে।
কিন্তু জাপানে আমার জীবনের প্রথম কয়েক বছর শুধু ভাষা শেখার গল্প ছিল না। এর সাথে ছিল কঠিন পরিশ্রমের গল্পও।
সেই সময় আমার জীবনটা কেমন ছিল, সেটাই বলবো পরের পর্বে।
চলবে…

error: Content is protected !!