আমার গল্প -পর্ব ০৭:

টাকার কষ্ট, আর হিসাব করে বাঁচা

জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক কে জানেন? আমার জীবনে সেই শিক্ষক ছিল—টাকার অভাব। জাপানে আসার পর প্রথম কয়েক বছর আমি খুব কাছ থেকে বুঝেছি টাকার মূল্য কি।
আমরা অনেক সময় খরচ করি চিন্তা না করে। কিন্তু তখন আমার জীবনে প্রতিটি ইয়েনের আলাদা গুরুত্ব ছিল।
কত আয় করছি, কত খরচ হচ্ছে—সবকিছু হিসাব করে চলতে হতো। মাসের শেষে হাতে কত টাকা থাকবে, সেটা ভাবতে হতো প্রতিদিন।
নিজের খরচ চালাতে হবে , পরবর্তী সেমিস্টার এর টিউশন ফি জমাতে হবে , দেশে কিছু টাকা পাঠাতে হৰে।
আমি বাবাকে হারাই ১৯৯২ সালে , সে ছিল সৎপথে চলা একজন অতি সাধারণ মানুষ। কে দিবে আমার খরচ ?
আমাদের রক্তের কাছের অনেক আত্মীয় -স্বজনরা অনেকেই অনেক অনেক ধনী ছিল , কিন্তু তখন কারুর দেখা পাইনি বিন্দু মাত্র।
শিখেছিলাম , নিজেকেই এগিয়ে নিতে হবে , অসময়ে কেউ কাছে থাকবে না।
অনেক বছর পার করে এসে এখন মনে হয় , কারুর সাহায্য না পাওয়াটাই আমার জন্য আশীর্বাদ ছিল।
বাস্তবতা কে বন্ধু বানিয়েছিলাম বলেই এখন আলহামদুলিল্লাহ একা একা চলতে শিখেছি , কারুর করুনার অপেক্ষা না করে নিজেকে নিজের মত করে সাজাতে পেরেছি। কারুর উপর নির্ভরশীল না , স্বাধীনচেতা একজন সাধারণ মানুষ হতে পেরেছি।
প্রথম ৫-১০ বছর অনেক সময় নিজের ইচ্ছা দমিয়ে রাখতে হয়েছে।
কিছু কিনতে ইচ্ছা করেছে, কিন্তু কিনিনি।
কোথাও যেতে ইচ্ছা করেছে, কিন্তু যাইনি।
কারণ আমি জানতাম, এই সময়টা আমার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময় যদি আমি নিয়ন্ত্রণ না করি, তাহলে সামনে এগোনো কঠিন হয়ে যাবে।
শুরুতে বিষয়টা সহজ ছিল না। বন্ধুরা হয়তো কোথাও যাচ্ছে, কিছু কিনছে—কিন্তু আমি নিজের হিসাব ধরে রাখতাম। অনেক সময় মনে হতো, আমি কি খুব বেশি কঠিনভাবে জীবন কাটাচ্ছি? কিন্তু আজ পিছনে তাকালে বুঝি, সেই সময়টাই আমাকে গড়ে দিয়েছে।
আমি তখন একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস শিখেছিলাম। টাকা উপার্জন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো টাকা নিয়ন্ত্রণ করা।
যে মানুষ কম টাকায় চলতে পারে, সে ভবিষ্যতে বেশি টাকাও ঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে। এই অভ্যাসটা পরে আমার জীবনের অনেক বড় সিদ্ধান্তে সাহায্য করেছে।
সঞ্চয়, বিনিয়োগ—এসব সব কিছুই শুরু করেছিলাম এই ছোট ছোট অভ্যাস থেকে।
আরেকটা জিনিস আমি তখন বুঝেছিলাম। টাকা শুধু খরচ করার জন্য না। টাকা আপনাকে সময় কিনে দেয়, নিরাপত্তা দেয়, ভবিষ্যৎ তৈরি করার সুযোগ দেয়।
কিন্তু এই বিষয়টা বুঝতে হলে প্রথমে কষ্টটা বুঝতে হয়।
আজ যদি আমি একটু হিসাব করে চলতে পারি, যদি ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতে পারি—তার পেছনে এই সময়টার অবদান সবচেয়ে বেশি।
জীবনের কিছু কিছু সময় আরামদায়ক না। কিন্তু সেই কঠিন সময়গুলোই আমাদের ভিতরটা শক্ত করে দেয়।
কিন্তু টাকার কষ্টের পাশাপাশি আমার জীবনের আরেকটা বড় অধ্যায় ছিল—
কঠিন পরিশ্রম।
প্রথম কয়েক বছর আমার জীবনটা কেমন ছিল, সেটা বলবো পরের পর্বে।
চলবে…

error: Content is protected !!