আমার গল্প -পর্ব ০৮:

৭ বছর প্রায় ছুটি ছাড়া জীবন

জীবনে এমন একটা সময় ছিল, যখন “ছুটি” শব্দটা আমার জীবনে প্রায় ছিলই না।
শুনতে হয়তো একটু অবাক লাগবে, কিন্তু জাপানে আমার প্রথম প্রায় ৭ বছর—আমি খুব কমই ছুটি নিয়েছি।
শুধু মাত্র সপ্তাহে বুধবার দিন ৩ ঘন্টা ফাঁকা থাকতো। এই সময় সাধারণত ঘুমায় নিতাম।
আমি স্টুডেন্ট অবস্থায় বিভিন্ন ধরণের পার্ট টাইম কাজ করেছি , যেমন ;
১. ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে ওয়েটার এর কাজ
২. Renaissance Five Star হোটেলে , বেল বয় এর কাজ , ফ্রন্ট ডেস্কে কাজ (এই সময় প্রচুর টিপস পেয়েছি)
৩. বয়স্ক মানুষদের বাড়ির সামনে বফর কাটা (কাজটা কঠিন , কিন্তু ৩-৪ ঘন্টায় ১০ হাজার ইয়েন পেতাম )
৪. গলফ কোর্ট এ বল কুড়ানো (দুই তিন ঘন্টা দৌড়ায় দৌড়ায় বল সংগ্রহ করতে হতো,হাই পেইড জব )
৫. Kumon এ বাচ্চাদের ইংলিশ শিখানো (এই জবটা ৬.৫ বছর continue করেছি)
৬. ইংলিশ পোড়ানো , প্রাইভেট ভাবে কিংবা কোম্পানিতে যেয়ে। (সর্বোচ্চ ১ ঘন্টায় ১০ হাজার ইয়েন ও বেতন পেয়েছি )
আমার জাপানিজ লেভেল যখন ভালো হতে শুরু করলো , আমি ও তখন জব চেঞ্জ করে হাই পেইড জব এ যেতে থাকলাম। আমি যেহেতু ভালো জাপানিজ শিখে গিয়েছিলাম , তাই হাই পেইড পার্ট টাইম ছাড়া করতাম না।
তখন আমার জীবনে একটা পরিষ্কার লক্ষ্য ছিল। আমি জাপানে ঘুরে বেড়াতে আসিনি , দেশ , পরিবার , বন্ধু , আত্মীয় স্বজন ছেড়ে এসেছি , এটা আমাকে পুষায় নিতে হবে।
আমাকে টিকে থাকতে হবে।
আমাকে শিখতে হবে।
আমাকে আগাতে হবে।
সেই সময় আমি একটা জিনিস বুঝে গিয়েছিলাম—
এই সময়টা যদি আমি হালকা ভাবে নেই, তাহলে পরে আফসোস করতে হবে।
তাই আমি নিজের সাথে একটা চুক্তি করেছিলাম।
“এই কয়েকটা বছর আমি নিজেকে তৈরি করবো।”
সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস—আমি শুধু পড়াশোনা আর কাজ করেছি। কোন দিন কোথাও আড্ডা দিতে যাই নি , টাকার অপচয় করি নি।
অনেক সময় শরীর ক্লান্ত হয়ে যেত।
মনে হতো একটু বিশ্রাম নিই।
কিন্তু তারপর নিজেকেই আবার মনে করাতাম—
“এখন না, পরে।”
এই “পরে” কথাটা আমাকে অনেক দূর নিয়ে গেছে।
আমি ছুটি নেইনি মানে এই না যে আমি কষ্ট পাইনি।
অনেক সময় খুব একা লাগতো।
বন্ধুরা হয়তো ঘুরতে যাচ্ছে, আনন্দ করছে—আমি কাজে যাচ্ছি।
কখনো কখনো মনে হতো—আমি কি কিছু মিস করছি?
কিন্তু আবার নিজেকে বলতাম—
“আমি এখন যা করছি, সেটা ভবিষ্যতের জন্য।”
এই সময়টাতে আমি শুধু কাজ করিনি।
আমি পড়াশোনা করেছি।
আমি শিখেছি।
কাজ শিখেছি।
ভাষা শিখেছি।
মানুষকে বুঝতে শিখেছি।
নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছি।
সেই থাকে জীবনে একা একা বাঁচতে শিখে গেলাম।
কারুর সাহায্য ছাড়া চলতে শিখলাম, নিজের জীবনের কন্ট্রোল পুরাপুরি নিজের হাতে নিয়ে নিলাম।
আমি এখন ও একা , কিন্তু এখন আমার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আমার ওয়াইফ।
আলহামদুলিল্লাহ,
আল্লাহ আমাকে একজন দারুন জীবন সঙ্গী দিয়েছে , সে খুব সাধারণ একজন পজিটিভ মেয়ে।
সোনা-গয়না , টাকা -পয়সা, দামি গাড়ি -দামি বাড়ি , শো অফ, কোন কিছুর উপর কোন লোভ নেই তার , তার একটাই উদ্দেশ্য আমাদের তিনজন বাবুকে মানুষের মত মানুষ করা।
আমি তার থেকে ১০ বছর বয়সে বড় , কিন্তু প্রতিনিয়তই তার কাছে থেকে আমি শিখছি। সে আমার একজন দারুন বন্ধু ও বটে।
বর্তমানে আমার প্রধান সম্পদ হলো আমার তিন বাঁচ্চা। আমি ওদের সাথেই বেশি সময় কাটাই।
আজ অনেক বছর পরে এসে অনুভব করি যে —এই ধারাবাহিক পরিশ্রম আমাকে ভিতর থেকে বদলে দিয়েছে ।
আমার সহ্য করার ক্ষমতা বেড়েছে।
আমার ধৈর্য বাড়ছে।
আমার আত্মবিশ্বাস ও বাড়ছে।
আজ যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে—এই ৭ বছর কি খুব কঠিন ছিল?
আমি বলবো—হ্যাঁ, ছিল।
কিন্তু এই ৭ বছরই আমার জীবনের ভিত্তি তৈরি করেছে।
সবাই এইভাবে চলতে পারবে না, প্রয়োজনও নেই।
কিন্তু জীবনে একটা সময় আসে, যখন আপনাকে একটু extra দিতে হয়।
যখন আপনাকে অন্যদের থেকে একটু বেশি পরিশ্রম করতে হয়।
মাঝে মাঝে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা হয় যে ;
“আমার শরীরে কোন হারাম পয়সা নেই ” কি যে দারুন অনুভূতি বোঝাতে পারবো না।
আজ আমি যদি একটু দাঁড়াতে পেরে থাকি, তার পেছনে এই “ছুটি ছাড়া” দিনগুলোর অবদান সব চেয়ে বেশি।
কিন্তু জীবনে শুধু কাজ করলেই হয় না।
একসময় আমি বুঝলাম—শুধু কাজ করে গেলে হবে না, আমাকে স্মার্টভাবে এগোতে হবে।
সেই পরিবর্তনটা কীভাবে এলো, সেটাই বলবো পরের পর্বে।
চলবে…

error: Content is protected !!